ইসতেকামাত আরবী শব্দ। এর অর্থ আমরা অনেকে বুঝি। ইসতেকামাত বলা হয়, কোনো নেক আমল গুরুত্বের সাথে নিয়মিত করা। শুরু করলাম, আবার ছেড়ে দিলাম, আবার অনেক দিন পর কোনো সময় হঠাৎ মনে পড়ল, তখন করলাম–এমন নয়। বরং আল্লাহর তাওফীক ও মেহেরবানীতে নেক আমলটা যেহেতু শুরু করেছি, আমলটা গুরুত্বের সাথে নিয়মিত করতে থাকব।
তবে কাজটা তো করছি আমি দ্বীনের কাজ হিসেবে এবং আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য । সেজন্য যদি দ্বীনেরই তাকাযা আসে–এখন তুমি এই কাজ না করে অন্য কাজ করো, তাহলে ঠিক আছে। অন্যথায় শরীয়তসম্মত ওজর ছাড়া শুধু অবহেলা ও অলসতার কারণে এই আমল আমি ছাড়ব না।
যেমন শবগুযারিতে হাজির হওয়া। এটি একটি নেক কাজ। এই কাজ শুরু করার পর উচিত হল গুরুত্বের সঙ্গে নিয়মিত এই কাজে শরীক হওয়া। হাঁ, যদি শরয়ী কোনো ওজর বা হালাত সামনে আসে কিংবা নিজের কোনো জরুরি কাজ থাকে, যার কারণে শবগুযারিতে হাজির হওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তাহলে ভিন্ন কথা। নতুবা শুধু অলসতা বা ভালো না লাগার কারণে অনুপস্থিত থাকা ঠিক নয়; যদিও তা নাজায়েয নয়। নাজায়েয হবে ফরয ও ওয়াজিবের ক্ষেত্রে। ফরয ও ওয়াজিব তার নির্ধারিত সময় থেকে পেছানো যায় না। যেমন ফরয নামায। এর সময় নির্ধারিত। সুতরাং কেউ যদি বলে, মনটা ভালো লাগছে না, আজকে নামায পড়ব না বা পরে পড়ব, সেটা কখনও জায়েয হবে না।
শুনুন! সবসময় যদি নেক কাজের জন্য মন আগাতো এবং মনে ভালো লাগত তাহলে মুজাহাদার কী দরকার ছিল? মুজাহাদার প্রয়োজন তো এজন্যই যে, সবসময় মন প্রস্তুত হয় না। যখন মন অগ্রসর হয়, আলহামদু লিল্লাহ। মন এগুচ্ছে না, তো মনকে এগিয়ে নিতে হবে। মানুষ বলে, মন মজবুত হলে শরীরও চলে। কিন্তু মুজাহাদা বলা হয়, মন যখন চলতে চায় না তখনও শরীর মনকে চালাবে। কেন মন চাইবে না, কেন ভালো লাগবে না, আমি ইনশাআল্লাহ ভালো লাগিয়ে ছাড়ব! নেক কাজের জন্য এরকম মুজাহাদা করা। গোনাহের ক্ষেত্রে এর একদম উল্টো। মনের ইচ্ছা হবে, তবে এই ইচ্ছার কোনো মূল্য নেই। আমার আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন–এই কাজ আমি কিছুতেই করব না।
যে কোনো নেক আমলের ক্ষেত্রে ইসতেকামাত একটি গুরুত্বপূর্ণ সিফাত। এই সিফাত যদি না থাকে, কোনো নেক আমল নিয়মিতও করা যায় না, গুরুত্বের সাথে ভালোভাবেও করা যায় না।
আমাদের এই শবগুযারির আমল আমরা প্রতি বৃহস্পতিবার নির্দিষ্ট একটি মসজিদে করে থাকি।
তবে শবগুযারি, শবগুযারির সময় ও শবগুযারির স্থান কোনোটাই শরীয়ত নির্ধারণ করে দেয়নি; বরং মশওয়ারার মাধ্যমে আমরা এগুলো ঠিক করেছি। তাই মশওয়ারার মাধ্যমে এগুলোতে পরিবর্তন হতে পারে এবং কেউ যদি শবগুযারিতে শরীক না হয়, বলা যাবে না–সে গোনাহের কাজ করেছে।
এর মানে কখনো এই নয় যে, আগামী সপ্তাহ থেকে আমাদের জন্য ছাড় হয়ে গেছে; আর না আসলেও চলবে। হুজুর তো বলে গেলেন, না আসলে কোনো গোনাহ নেই; আজকে তো অমুক ভাইয়ের তাশকীলের কারণে এসেছি, সামনে যতই তাশকীল করুক, আমি আসব না! খবরদার! আমি এটা বলিনি।
আমি যেটা বোঝাতে চাচ্ছি–কিছু আমল এমন, যেগুলোর সময় শরীয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। আবার কিছু আমল এমন, যেগুলোর সময় শরীয়ত নির্ধারণ করে দেয়নি, বরং তা মুমিনদের মশওয়ারার ওপর ছেড়ে দিয়েছে। এই দুইয়ের পার্থক্য আমাদের বুঝতে হবে। কিন্তু সে পার্থক্য করা মানে কখনো এই নয়–যে আমলের সময় নির্ধারিত নেই সে আমল আমরা ছেড়ে দেব। বরং উদ্দেশ্য হল, এই দুইয়ের মাঝে যে পার্থক্য সেটা আমার ইলমে থাকা। অর্থাৎ এটা শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত সময় আর সেটা মশওয়ারার মাধ্যমে ঠিক করা সময়। এটা আমার জানা থাকতে হবে। যে আমলের ক্ষেত্রে শরীয়ত সময় নির্ধারণ করে দেয়নি, নির্ধারণ না করার একটা উদ্দেশ্য তো হল, আমলটা যেন বেশি বেশি হয়। প্রয়োজনের সময় যেমন ছাড় নেয়া যায়, আবার সুযোগমত যেন বেশি বেশি করা যায়। কারণ সময় যেহেতু নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি, তাই এখন করতে না পারলে পরে করা যাবে এবং আরও বেশি করে করা যাবে।
আজকে কোনো কারণে আপনি পাঁচ কাজ করতে পারেননি, তো পরে সেটা পুষিয়ে নেয়া যাবে। শবগুযারিতে কোনো ওজরের কারণে আসতে না পারলে মনে আফসোস থাকবে, আহারে! আমার রুটিনটা ভঙ্গ হল!
দেখুন, ইসতেকামাত কিন্তু ফরয-ওয়াজিবের ক্ষেত্রে প্রকাশ পাবে না। কারণ সেখানে করা না করার মধ্যে আপনার কোনো ইখতিয়ার নেই। সেটা তো শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত। ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নতে মুআক্কাদার জন্য শরীয়ত সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে। আমি চাইলেও সেটা পরিবর্তন করতে পারব না। বরং সেখানে আমি ইসতেকামাত করতে বাধ্য। আমার মধ্যে ইসতেকামাত আছে কি না সেটা বোঝা যাবে মুসতাহাব আমলের ক্ষেত্রে। ওই নেক আমলের ক্ষেত্রে যে নেক আমলের জন্য শরীয়ত সময় নির্ধারণ করে দেয়নি, বরং বলেছে, তোমরা মশওয়ারা করে একটা সময় ঠিক করো! করা দরকার; তোমরা তোমাদের সুবিধামতো করো!
এখানে হবে ইসতেকামাতের পরীক্ষা। দেখা হবে, সুবিধামতো একটা সময় ঠিক করার পর আমি সেটার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছি কি না।
যদি দেখা যায়, অলসতা-অবহেলা করে আমি রুটিন ভঙ্গ করি না, ঠিক রাখি, বোঝা যাবে, আলহামদু লিল্লাহ, আল্লাহর রহমতে আমার মধ্যে ইসতেকামাতের সিফাত পয়দা হচ্ছে। আর যদি এমন হয়। আমি ঠিকমত কাজ করি না, একদিন করি আরেকদিন করি না, অলসতা করি, বোঝা যাবে, আমার মধ্যে ইসতেকামাত নেই।
তাহলে আমরা সবাই ইসতেকামাতের সিফাত চাই কি না? অবশ্যই চাই। ইসতেকামাতের সিফাত বোঝা যাবে এভাবে–আমি ইশরাকের নামায নিয়মিত পড়ি কি না? আওয়াবিন নিয়মিত পড়ি কি না? শবগুযারিতে নিয়মিত আসি কি না? পাঁচ কাজ নিয়মিত গুরুত্বসহকারে করি কি না? মসজিদের হুজুরের কাছ থেকে নামায ও কুরআনে কারীম শেখার জন্য সময় নিয়েছি, সেটাতে ঠিকমতো উপস্থিত হই কি না? যদি এমন হয়–হুজুর ঠিকই হাজির, কিন্তু আমি নেই, তাহলে কী হবে? মসজিদে ইমাম সাহেব এলান করে দিয়েছেন–ফরযে আইনের ইলম শেখানো হবে, কুরআন মাজীদ মশক করানো হবে, নামায মশক করানো হবে, সুন্নতের মশক হবে। এরপর হুজুর হাজির, কিছু সাথীও হাজির, আমি প্রথম ক’দিন ছিলাম, এখন আর নেই! এটা কি ইসতেকামাত হল? আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ইসতেকামাত দান করুন।
